সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

First Youth News Portal in Bangladesh

add 468*60

শিরোনাম

সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ডেঙ্গু বিষয়ে জরুরি বার্তা: প্রয়োজন সতর্কতা দেশে এক তৃতীয়াংশ যুবক বেকার : ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শিশুর প্রতি যৌনসহিংসতা: নজরদারি মানেই নিরাপত্তা নয় সবুজের সমারোহ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির যাবতীয় কার্যক্রম এখন  মোবাইল এ্যাপস "এডমিশন এসিস্ট্যান্ট" এ মানুষ স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে না, স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে; মাশরাফি: এক উদ্দীপনার নাম সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত দূরীকরণে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে সৃষ্টিশীল তারুণ্য আক্রান্ত তারুণ্য, বিপর্যস্ত তারুণ্য ৭১-এর আওয়ামী লীগের ভাবনায় তারুণ্য তারুণের ভাবনায় আওয়ামী লীগ শীর্ষক মতবিনিময় ২৯ জুন বাংলাদেশের প্রথম আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর হচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) বিশ্ব উদ্যোক্তা সম্মেলনে বাংলাদেশের ৬ তরুণ

খাবার স্যালাইন বিশ্বব্যাপী পাঁচ কোটি শিশুর জীবন রক্ষা করেছে

খাবার স্যালাইন

গ্রামগঞ্জে মুদিদোকানেও এখন পাওয়া যায় খাওয়ার স্যালাইন। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে স্যালাইনের প্যাকেট কিনে ফিরছেন এক বাবা। গতকাল বগুড়ার কাহালুর সাবানপুর গ্রামে। সোয়েল রানা

পাঁচ কোটি শিশুর প্রাণ রক্ষা
গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রয়োগ-সবই বাংলাদেশে
খলিল মাতবরের বাসা রাজধানীর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি। মাঝেমধ্যেই এলাকার মুদিদোকান থেকে খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট কেনেন। জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘ছেলের প্যাটে ব্যথা হইলেই কিনি। কারও পরামর্শে না। খাওয়াইলে ছেলেডার ভালো লাগে, তাই কিনি।’

পাড়ামহল্লার ওষুধের দোকানের পাশাপাশি এখন মুদিদোকানেও নানা রকম সওদাপাতির সঙ্গে স্যালাইনের প্যাকেট থাকে। দোকানিরা বলেছেন, গরম বাড়ছে, বিক্রিও বাড়ছে। গরমে ঘাম ঝরলে বা কায়িক পরিশ্রমের পর অনেকেই নিয়মিত স্যালাইন খান। অনেকের বাড়িতে স্যালাইন মজুত থাকে।

সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি) ১৯৮৫ সাল থেকে খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন) বাজারজাত করছে। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন বিভাগের প্রধান খন্দকার শামীম রহমান গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে 
বলেন, তাঁদের হিসাব বলছে, চলতি ২০১৭-১৮অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন বিক্রি হবে।

এক প্যাকেট স্যালাইন আধা লিটার পানিতে গুলে খেতে হয়। এতে শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে স্যালাইনের প্যাকেট পাওয়া না গেলে আধা লিটার বিশুদ্ধ পানিতে এক মুঠ চিনি বা গুড় এবং এক চিমটি লবণ গুলে খেলে একই কাজ হয়। সহজ এই প্রযুক্তি এখন বিশ্বব্যাপী ডায়রিয়া বা উদরাময় চিকিৎসার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ ডায়রিয়া বা উদরাময়। প্রতিবছর ৫ লাখ ২৫ হাজার শিশুর এতে মৃত্যু হচ্ছে। ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে পানি দ্রুত বের হয়ে যায়। ওআরএস সেই পানি প্রতিস্থাপন করে। এটি বিশ্বব্যাপী এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কোটি শিশুর জীবন রক্ষা করেছে।

ওআরএস এল কোথা থেকে

ওআরএস নিয়ে গবেষণা, এর আবিষ্কার, মানুষের কাছে পৌঁছানোর কৌশল, মানুষকে ওআরএস বানাতে শেখানো—সবকিছুই হয়েছে বাংলাদেশে। মূল গবেষণা করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা। এটির সাবেক পরিচালক কে এম এস আজিজ গত বছর প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘শুধু আইসিডিডিআরবি নয়, পুরো বাংলাদেশই ছিল ওআরএসের গবেষণাগার। এখন বিশ্ব এর সুফল পাচ্ছে।’

গত শতকের ষাটের দশকে কলেরা গবেষণার জন্য মহাখালীতে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (সিআরএল, বর্তমানে আইসিডিডিআরবি) স্থাপন করা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা এখানে কাজ শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশি গবেষকেরা।

আইসিডিডিআরবি সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কলেরা রোগীদের পানিশূন্যতা দূর করতে ১৯৬৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময় ফিলিপাইন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কলকাতায় নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। কোনোটিতেই খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। ১৯৬৮ সালে মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় চাঁদপুরের মতলবে ও ঢাকায়। এর মূল গবেষক ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড এ ক্যাস। অনেকে এই দুই বিজ্ঞানীকে ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন। ওই গবেষণার সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম (সম্প্রতি মারা গেছেন) ও মজিদ মোল্লা। তাঁদের গবেষণার ফলাফল নিয়ে ১৯৬৮ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট-এ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাই কার্বনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানো হয়। এতে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রবন্ধের শেষ দিকে বলা হয়, এই দ্রবণের উপাদানগুলো সস্তা ও সহজপ্রাপ্য। এরপর থেকে আইসিডিডিআরবির মহাখালীর কলেরা হাসপাতালে ডায়রিয়ায় পানিশূন্যতা দূর করতে ওআরএস ব্যবহার শুরু হয়।

আইসিডিডিআরবির একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সাবেক একাধিক বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেছেন, ওআরএস আবিষ্কার একক কোনো বিজ্ঞানীর কৃতিত্বে হয়নি। গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক দিন ধরে কাজ করেছেন। চূড়ান্ত রূপটা এসেছে ১৯৬৭-৬৮ সালে।

গণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানিয়েছেন, স্যালাইন প্যাকেটজাত করার কাজটি ১৯৮১ সাল থেকে প্রথম শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

আইসিডিডিআরবির নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সায়েন্সেস বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক তাহমিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুষ্ট, শিশুস্বাস্থ্য বা ডায়রিয়াজনিত রোগবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই, সবখানেই ওআরএস নিয়ে আলোচনা হয়, আর তাতে অবধারিতভাবে বাংলাদেশ ও আইসিডিডিআরবির নাম উচ্চারিত হয়। গর্বে বুক ভরে যায়।’

আইসিডিডিআরবি ওআরএস তৈরির ফর্মুলা পেটেন্ট (মেধাস্বত্ব আদায়) করেনি। এ নিয়ে সামান্য হলেও কারও কারও মধ্যে হতাশা আছে। আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে আইসিডিডিআরবির গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজে জড়িত ছিলেন। প্রবীণ এই বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওআরএস পেটেন্ট করা হয়নি, পেটেন্ট করার চিন্তাই করা হয়নি। উই মিসড দ্য ট্রেইন (আমরা ট্রেন ধরতে ব্যর্থ হয়েছি)।’