মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

First Youth News Portal in Bangladesh

add 468*60

শিরোনাম

সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ হচ্ছে না শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চাপ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে ফেলেছে সাজগোজের রিমি নির্বাচনী ইশতেহারে তরুণদের প্রত্যাশা কীভাবে নিবেন একটি বুদ্ধিদীপ্ত ও স্মার্ট ডিসিশন ফ্রেশাররা কেন চাকরি পায়না ইন্টারভিউ নেয়ার সঠিক ও জরুরি কৌশল ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়ুথ সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত মিটিং করার আগে ভাবুন তারুণ্যের উৎসব বাংলাদেশ ইয়ুথ সিম্পোজিয়াম-২০১৮ অনুষ্ঠিত হবে ৩০শে অক্টোবর ভয়ংকর আগস্ট ভালো হতে চেয়েছিলাম (ছোটগল্প) এইচআর নিয়ে একডজন ভুল ধারনা এবং উত্তর বিশ্ব শান্তির প্রসারে দক্ষিণ কোরিয়ার শান্তি সামিট অনুষ্ঠিত আত্মহত্যা নয়, জীবনকে উপভোগ করুন

আত্মহত্যা নয়, জীবনকে উপভোগ করুন

মোহনা

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন- "আমাকে যদি কাদার মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বেঁধে রাখা হয়, তবু আমি বেঁচে থাকতে চাইবো" জনপ্রিয়  সাহিত্যিকের এ কথা'টা থেকেই বোঝা যায়, বেঁচে থাকার আকুলতা কতোটা গভীর হতে পারে। আমরা জানি, তাঁর জীবনে কতোটা কঠিন সময় পাড় করতে হয়েছে, তিনি দেশভাগের বীভৎসতা দেখেছেন, একাত্তরের যুদ্ধের নির্মমতাও দেখেছেন, চরম অভাব অনটনের সাথে যুদ্ধ করে দিনাতিপাত করেছেন, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যতার সাথে লড়েছেন, এতোকিছুর পরেও তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছেন, ভীষনভাবে চেয়েছেন। অথচ আমরা কতো সহজে বেঁচে থাকার স্পৃহা হারিয়ে ফেলি। হাত-পা বিহীন যে লোকটা এ শহরের পিচঢালা পথে রোদ বৃষ্টিতে বুকে ভর দিয়ে মানুষের কাছে হাত পেতে এক একটা দিন বেঁচে থাকে, তাকে দেখে অবাক হয়ে যাই এটা ভেবে যে, এতো কঠিন অক্ষমতার পরেও তিনি বেঁচে থাকার শক্তি কোথা থেকে পান!

জীবন তো উপভোগের বিষয়। এক একটা দিন আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকাটাই জীবন। প্রতিটা দিন নিত্য নতুন ভাবে বেঁচে থাকাটাও একটা আর্ট। যদি বেঁচে থাকার মতো একটা কারনও খুঁজে না পাই আমরা, সেক্ষেত্রে শুধু বাঁচার জন্য হলেও আমাদের বাঁচতে হবে।

ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন এর তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে যেসব দেশে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- কোরিয়া, শ্রীলংকা, লিথুনিয়া, নেপাল, কাজাখিস্তান ইত্যাদি। বাংলাদেশও কিন্তু পিছিয়ে নেই। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন এর এপ্রিল ২০১২ সালের তথ্যমতে, বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার ২.০৬ পার্সেন্ট এবং সিরিয়ালে ৩৮ তম। অর্থাৎ প্রতি বছর অনেকগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, যা খুব দুঃখজনক। আর এই আত্মহত্যার প্রবণতা দিনের পর দিন বেড়েই যাচ্ছে, বিষবৃক্ষের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা দেশের আনাচে কানাচে। এক একটা দিন বেঁচে থাকাটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। 

অস্কার ওয়াইল্ড বলে গেছেন- "To live is the rarest things in the World. Most people exist, that is all"
বেঁচে থাকাটা সত্যিই দূর্লভ ব্যাপার। যেখানে রোজ শত সহস্র মানুষ নানাবিধ কারনে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেখানে আরো একটা দিন বেশি বেঁচে থাকাটা সত্যিই এক দূর্লভ উপহার।

সমস্যা নিয়েই আমাদের গোটা একটা জীবন কেটে যায়। তবু সেই সমস্যার ফাঁকফোকর দিয়ে পৌষালী রোদের মতো যে সুখটুকু আমরা পাই, সে সুখটুকুকেই যদি আমরা আমাদের জীবনের সোনালী সঞ্চয় হিসেবে তুলে রাখতে পারি,
তাহলেই আমরা এক একটা দিন বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পাবো। 

ভালো থাকার জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয়না। কেও কেও প্রাচুর্যের পসরা নিয়েও অসুখী থাকে, কেও আধপেটা খেয়েও ঠোঁটের কোণে মুক্তোদানার মতো নির্ভেজাল হাসি ছড়িয়ে রাখতে পারে। এ সবটা আমাদের চিন্তাধারার ওপর নির্ভর করছে। আমাদের ভাবনার জগৎ থেকে চাহিদা নামক বস্তুটাকে যদি ক্রমশ সংকীর্ণ করে তুলতে পারি, তবেইনা আমরা আত্মতৃপ্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবো। 

আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, অতীতের জন্য নয়, আগামী দিনগুলোর জন্য আমাদের বাঁচতে হবে। অনাগত দিনগুলো যেনো মোড়কে জড়ানো এক উপহার। সেই মোড়কের অভ্যন্তরে কি লুকিয়ে আছে, তা জানার তীব্র স্পৃহাই আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। 

আমরা চাইলেই একটা রক্তিম গোধূলী কিংবা বালুচরে বসে কাটানো একটা পূর্ণ চাঁদের জ্যেস্নারাতের জন্য বেঁচে থাকতে পারি। যখন খুব একা মনে হবে, বিশ্ব ব্রক্ষান্ডের শত সহস্র মানুষের ভীড়েও নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হবে, তখন জেনো সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টির মালিকানাহীন সবকিছুই তোমার সাথে আছে, মাথার ওপর মস্ত বড় একটা আকাশ, নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য নির্ভেজাল  বাতাস, সবকিছুই তোমার সঙ্গী।

যখন চারপাশের পৃথিবীটা অসহ্য লাগবে, কাছের মানুষগুলোকে অচেনা মনে হবে, বহু সমস্যায় জর্জরিত হয়ে যাবে তোমার প্রাত্যাহিক জীবন, তখনো খুঁজে দেখবে বেঁচে থাকার জন্য তোমার চারপাশে অনেকগুলো কারন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুধু সে কারনগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে তোমাকে বেঁচে থাকা শিখতে হবে।

অনেকের কাছেই মনে হয়, মৃত্যু এবং একমাত্র মৃত্যুই সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু যে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবার জন্য তুমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে, সে যন্ত্রনার চেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রনার দিকে যে তুমি পা বাড়াচ্ছো, সেই বোধোদয় জাগ্রত করতে হবে। আর আমরা হয়তো ভাবি, মরে গেলেই বেঁচে যাবো, বড্ড বাঁচা বেঁচে যাবো। বাস্তবতা কি তাই বলে? আমরা হয়তো মরে যাই ঠিকই, কিন্তু এ পৃথিবীর বুকে জীবন্মৃত করে রেখে যাই আমাদের কাছের মানুষদের। আত্মহত্যা মানে তো শুধু নিজেকে হত্যা করা নয়, কিছু মানুষকে জীবন্ত লাশ করে রেখে যাই আমরা। সেই জীবন্ত লাশগুলো বাকিটা জীবন কতোটা দগ্ধতা নিয়ে বেঁচে থাকে, তা আর জানা হয়না আমাদের। 

আমাদের বুকের প্রতিটা হৃদস্পন্দন নীরবে বেঁচে থাকার একেকটা কারন বলে যায়। আমরা শুধু সে কারনগুলোকে খোঁজার চেষ্টা করিনা।

জীবনে কিছু কিছু সমস্যার কোনো সমাধান হয়না। মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার আপোষে চাপা পড়ে যায় অনেক সমস্যা। জীবনে সমস্যা থাকবেই। সে সমস্যা কেটে না গেলেও একটা সময় শিথিল হয়ে আসে। কিন্তু আমরা অনেকেই সেসব সমস্যার মোকাবেলা করার সাহস পাইনা, ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারিনা সমস্যার শেষটা দেখা পর্যন্ত। তারপর দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেই। হয়তো একটা সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আমরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেই, কিন্তু আমাদের মৃত্যু আরো হাজার সমস্যার পসরা সাজিয়ে আমাদের কাছের মানুষগুলোর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। আমরা শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবি, আমাদের চারপাশে ছায়ার মতো আগলে রাখা মানুষগুলোর কথা ভাবিনা। তাইতো বেঁচে থাকার কারনগুলো সহজেই ফিকে হয়ে যায়। 

জর্জ বার্নাড'শ বলেছেন- "Life is'nt about finding yourself. Life is about creating yourself"
আমরা অতীত ঘেঁটেই আমাদের বর্তমান আর ভবিষ্যৎটা নষ্ট করি। বর্তমানকে প্রাধান্য দেয়া সবচেয়ে জরুরি। বর্তমানটাকে যদি সুন্দরভাবে কাজে লাগিয়ে অর্থবহ করে তুলতে পারি, তাহলে এই বর্তমানই একদিন আমাদের সুখকর অতীত হয়ে ধরা দেবে। কিন্তু তা না করে আমরা কেবল অতীতের ব্যার্থতার ঝুলিতে নিজেদের খুঁজে বেড়াই, অথচ আমরা চাইলেই প্রতিটা দিন নিজেদের নতুনভাবে সৃষ্টি করতে পারি।

একটা ভুল সিদ্ধান্তের ফলাফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী। আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া যে মস্ত বড় ভুল সিদ্ধান্ত, এটা আমরা সবাই জানি। তবু যখন এ ভুল কাজটাই সংঘটিত করি, তখন আমাদের সব বোধোদয় লোপ পেয়ে যায়। আমরা কি কখনো শুধু বাঁচার জন্য বাঁচতে পারিনা? নিজের জন্য না হোক আমাদের কাছের মানুষগুলোর জন্য কি বাঁচতে পারিনা? ঝড়ের শেষে যেমন সহস্র যোজন দূর থেকে সূর্য তার আলোকরশ্মি ছড়িয়ে দেয় বিশ্ব চরাচর জুড়ে, তেমনি আমাদের জীবনেও সমস্যার আঁধার কেটে গিয়ে কিংবা শিথিল হয়ে আবার সবকিছু স্বাভাবিক করে দেয়। এর মধ্যকার সময়টা দুর্বিষহ হলেও, বেঁচে থাকার আনন্দটা তার চেয়ে অনেক বেশি।

আমাদের জন্ম একবারই হয় আর সে সময়টাও খুব ক্ষনস্থায়ী। সেই ক্ষনস্থায়ী সময়টা সুন্দরভাবে উপভোগ করাইতো জীবন। অথচ আমরা কেও কেও সেই ক্ষনস্থায়ী সময়টাও বেঁচে থাকার ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারিনা।

বাংলাদেশ দরিদ্র্য দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দারিদ্র্যতা আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারন। এছাড়া আরো অনেক কারন রয়েছে, যেমন- প্রেমে ব্যার্থতা, রেজাল্ট খারাপ হওয়া, বেকারত্ব ইত্যাদি। কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য কি একটাও কারন নেই? একজন দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষ যদি বেঁচে থাকার কারন খুঁজে পায়, তাহলে আমরা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কেনো বেঁচে থাকার কারন খুঁজে পাবোনা? একটা ঘাসফুল থেকে শুরু করে বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা থেকেই আমরা বেঁচে থাকার কারন খুঁজে নিতে পারি। 

আর আমরা শুধু বাঁচবোইনা, বাঁচার মতো বাঁচবো, একটা সত্যিকারের মানুষের মতো বাঁচবো।

Mae West বলেছেন-
"You only live once, but if you do it right, once is enough"

আমরা একবারই বাঁচার সুযোগ পাই। আসুন আমরা এই একজন্ম সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচি। পৃথিবীর বুকে অমরত্ব লাভের জন্য একজন্মই যথেষ্ঠ। আত্মহত্যা নয়, জীবনকে উপভোগ করুন....

মোহনা: কলেজ অব হোম ইকোনোমিক্স, আজিমপুর।