মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

First Youth News Portal in Bangladesh

add 468*60

শিরোনাম

ভিন্ন রঙে আঁকা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুরুত্ব ও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আত্মহত্যা সমাধান নয় যেভাবে প্রাণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখতে চাই অত:পর, কোন একদিন...... দ্রুত ওজন কমানোর কিছু কৌশল জাপানের সুমিতমো বৃত্তি পেল ঢাবির ৪০ শিক্ষার্থী চীন যাচ্ছে ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি) বাগেরহাটের ১০ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ও তরুণ প্রজন্ম জাপান সরকার দিচ্ছে মেক্সট স্কলারশিপ উচ্চ মাধ্যমিকের পর ক্যারিয়ার পরিকল্পনা মাসের খরচের টাকা বাঁচিয়ে ব্যতিক্রম লাইব্রেরি চালান রাজশাহীর বদর উদ্দিন ঢাকায় প্রথম পিআর অ্যান্ড ব্র্যান্ড কমস সামিট ২৬ অক্টোবর রাজনীতি-ক্ষমতা ও তারুণ্য গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও তারুণ্য

অ্যাম্বুলেন্সের স্টিয়ারিং হাতে তিন নারী

অনলাইন ডেস্ক

দুপুর তখন ১২টা। কিছুদিন আগের কথা। ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের পাশেই পার্কিংয়ে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁরা তিনজন। আগেই আলাপ হয়েছিল। তাই প্রথম দেখাতেই হাসিমুখে একজন বললেন, ‘এখানে অনেক ভিড়, চলেন নিরিবিলি কোথায় গিয়ে বসি।’
তাঁরা তিনজনই অ্যাম্বুলেন্সচালক। হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের চালক হিসেবে নারীদের সচরাচর দেখা মেলে না। সেই আগ্রহ নিয়ে তাঁদের কাছে যাওয়া।


তখনো নাম-পরিচয় জানা হয়নি। তিনজনের একজন অ্যাম্বুলেন্সের চালকের আসনে বসলেন। ধানমন্ডি ৬ নম্বর থেকে মিরপুর রোড পার হয়ে রোগীবিহীন অ্যাম্বুলেন্স চলতে শুরু করল। চালকের সদা সতর্ক দৃষ্টি চারপাশে। কিছুক্ষণ পর আমরা পৌঁছালাম ধানমন্ডি ৪ নম্বর মাঠের পাশে। জায়গাটা নিরিবিলি। তিন চালক নামলেন। চলল কথোপকথন।

নিজেই কিছু করতে চাইতেন রুই মা সং

এতক্ষণ যিনি ছিলেন চালকের আসনে, তিনি রুই মা সং। পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে বড় হয়েছেন তিনি। বয়স ২৮ বছর। দুই মেয়ে আর মা-বাবা নিয়ে রুই মা সংয়ের সংসার। চার বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলে নিজেই কিছু করার পথ খুঁজতে থাকেন। একসময় বিদেশে যাওয়ার চেষ্টাও করেছেন।

এমন সময়ই নিকটাত্মীয়ের কাছে জানতে পারেন নারীদের গাড়ি চালানোর ব্যাপারটি। এ কাজে পরিবারেরও সম্মতি ছিল। তাই ২০১৭ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চালকের জন্য আবেদন করেন তিনি। তিন মাস গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা শেষে তিনি প্রতিষ্ঠানটির গাড়িচালক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। নিয়োগ দেওয়া হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ধানমন্ডি শাখায়।

রুই মা সং বলছিলেন, ‘এখন আমি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাভার শাখায় কাজ করি। ধানমন্ডি শাখায় থাকতে আমি কখনো অ্যাম্বুলেন্স, কখনো মাইক্রোবাস চালিয়েছি। এখন অ্যাম্বুলেন্সই চালাই।’

প্রথম দিকে গাড়ি চালাচ্ছেন দেখে অনেক পুরুষ গাড়িচালক অবাক হতেন। অ্যাম্বুলেন্সের সেবাগ্রহীতা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বেলায় সেই বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে যেত অনেকখানি। রুই মা সং বলেন, ‘এমনও সেবাপ্রার্থী পেয়েছি, যারা বলে উঠত, “নারী আবার গাড়িচালক!”’

তবে গাড়ি চালানো শেখাটা তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার পায়ে আঘাত পেয়েছেন। প্রথম দিকে গতি সামলানো খুবই কঠিন মনে হতো রুই মা সংয়ের। তিনি বলছিলেন, ‘সব ভয়কে জয় করে এখন আমি মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমার মেয়ের মানসিক অবস্থাও এমন দেখতে চাই।’

নিজের গ্রামে মেয়েদের ড্রাইভিং শেখাতে চান মৌসুমী

২১ বছর বয়সী মৌসুমী আকতার কক্সবাজারে প্রশিক্ষণ শেষে মাস পাঁচেক হলো ঢাকায় এসেছেন। দিনাজপুরের মেয়ে মৌসুমীর আগ্রহ ছিল পড়াশোনায়। কিন্তু ২০১০ সালে পারিবারিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। বললেন, ‘মা আমাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাই জেদ করে একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বাসাতেই বসে ছিলাম। তবে বাবা সব সময় আমাকে কাজ করতে উৎসাহ দিতেন।’

মৌসুমীর বড় বোনও একজন গাড়িচালক। কক্সবাজারে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। বোনকে দেখে মৌসুমীও আগ্রহী হন এ পেশায়। কক্সবাজারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ স্কুলে গাড়ি চালানো শেখেন মৌসুমী। পাশাপাশি ভর্তি হয়েছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি এসএসসি প্রোগ্রামে। এসএসসি পাস করে এখন এইচএসসি পড়ছেন।

এই তিন মাসে অভিজ্ঞতাও কম নয়। গাড়ি চালাতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। একজন মেয়ে গাড়ি চালাবে এই ভয়ে শুরুতে অনেক রোগীই তাঁর অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে চাইতেন না। তবে এখন সেই অবস্থার মুখোমুখি কম হতে হয়—এ–ও জানালেন মৌসুমী।

এক ফাঁকে মৌসুমী তাঁর স্বপ্নের কথা শোনালেন, ‘আমি আমার গ্রামে মেয়েদের জন্য একটি ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যে মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, তাঁরাই সেখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন।’

নিজের একটি গাড়ির স্বপ্ন দেখেন শারমিন

রোবায়েত শারমিনের বয়স ২০ বছর। মা-বাবার সঙ্গে কক্সবাজারে থাকতেন। ছোট থেকেই গাড়ি চালানোর প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাই এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই পরিবারকে গাড়ি চালানো শেখার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে শুরু করা যায়? তাঁর এক ফুফু জানালেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশিক্ষণের কথা। তারপরই খোঁজখবর নিয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে এখন কাজ করছেন চালক হিসেবে।

রোবায়েত শারমিন বললেন, ‘রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। এই সতর্কতা শুধু গাড়ি চালানোই নয়, নারীর নিজের নিরাপত্তার জন্যও।’

শারমিন স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। একদিন নিজের একটি গাড়ি ও একটি বাড়ি হবে—এটিই এখন তাঁর স্বপ্ন।

শুরুটা ৩৩ বছর আগে

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র মেয়েদের গাড়ি চালনা শেখানো শুরু করে ৩৩ বছর আগে। প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক আকলিমা খাতুন জানালেন, ১৯৮৬ সালে একজন নারীকে নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা প্রথম ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে আনুষ্ঠানিক ড্রাইভিং স্কুলের মাধ্যমে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়।

এখন পর্যন্ত ২০০ জন নারী গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এই স্কুল থেকে। প্রতিবছর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ড্রাইভিং স্কুলে প্রায় ২৪ জন নারীকে গাড়ি চালানো শেখানো হয়, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁরা কাজ করতে পারেন। শুধু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রেই ৮ জন নারী চালক হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে রুই মা সং, রোবায়েত শারমিন আর মৌসুমী আকতার—এই তিনজন চালান অ্যাম্বুলেন্স। সৌজন্যে- প্রথম আলো